বর্ষা শুধু প্রকৃতিকে নয় বরং পর্যটকদের মনকেও সতেজ করে তুলে। বর্ষা কালে ভরা নদী, বৃষ্টি ভেজা প্রকৃতি ও মেঘে ঢাকা পাহাড় যেন বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান সমূহ সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুলে। প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ যেখানে সব মৌসুমে ঘুরে দেখার দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
বর্ষা মৌসুমে সবাই যখন ঘরে থাকে তখন প্রকৃতিকে পাওয়া যায় সজীব রূপে। আজকের আর্টিকেলে আমরা জানবো বর্ষা মৌসুমে ঘুরে দেখার বাংলাদেশের সেরা ১০ টি দর্শনীয় স্থান বা পর্যটন স্পট গুলোর সম্পর্কে।
বর্ষা মৌসুমে ঘুরে দেখার বাংলাদেশের সেরা ১০ টি দর্শনীয় স্থান
বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে ঘুরে দেখার জন্য অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এসব দর্শনীয় স্থান সমূহের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় সেরা ১০ টি দর্শনীয় স্থান উল্লেখ করবো।
#১. টাঙ্গুয়ার হাওর – সুনামগঞ্জ

টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি হাওর। প্রায় ১২৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই হাওর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর মিঠা পানির জলাভূমি। স্থানীয় লোকদের কাছে হাওরটি নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল নামে পরিচিত।
বর্ষা মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায় ১৪০ প্রজাতির মাছ, ১৫০ প্রজাতির সরীসৃপের জীববৈচিত্র্য, ১২ প্রজাতির দেখতে পাবেন। এছাড়া শীতের মৌসুমে প্রায় ২৫০ প্রজাতির অতিথি পাখির বিচরণ ঘটে। হাওরে ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৪৬ টি দ্বীপের মত ভাসমান গ্রাম আছে।
বর্ষায় হাউজ বোটে ঘুরে হাওরের সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, বৃষ্টি ভেজা প্রকৃতি ও চাঁদনী রাতের নীরব সৌন্দর্য আপনার ভ্রমণকে চিরদিন সরণীয় করে তুলবে। এছাড়া হাওরের আশেপাশে দর্শনীয় স্থান সমূহ দেখে আপনি মুগ্ধ হবেন।
#২. রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট – সিলেট

সিলেটের গোয়াইনঘাটে অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র জলাবন মনে করা হতো রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টকে। বর্তমানে পৃথিবীতে যতগুলো মিঠাপানির জলাবন রয়েছে তার মধ্যে রাতারগুল অন্যতম। এর আয়তন ৩,৩২৫.৬১ একর। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসাবে ঘোষণা করেন।
রাতারগুল জলাবনে প্রায় ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বেত, হিজল, কদম, পিঠালি, ছাতিম, অর্জুন, গুটিজাম ও বট গাছ অন্যতম। এছাড়া প্রাণিবৈচিত্র্যের মধ্যে বেজি, বানর, গুইসাপ, সাদা বক, মাছরাঙা, বুলবুলি, টিয়া, পানকৌড়ি, বাজপাখি ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে।
বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে থাকা বনের গাছ-পালা ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী দেখতে অসংখ্য পর্যটকদের আগমন ঘটে। রাতারগুল বন বিট অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে জলাবনের ভিতর প্রবেশ করতে ডিঙি নৌকায় প্রবেশ করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে ডিঙি নৌকায় রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্টের ভিতর গেলে আপনার মনে হবে আপনি আমাজন বনে আছেন।
#৩. জাফলং – সিলেট

জাফলং বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পট। পাথুরে নদীর স্বচ্ছ জলের জাফলং পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
এছাড়া পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলা পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানির ধারা, উঁচু পাহাড়ে সাদা মেঘের খেলা, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ জাফলংকে অনন্য করে তুলেছে। বর্ষা মৌসুমে পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলে গা ভিজালে আপনার সকল ক্লান্তি নিমিষেই দুর হয়ে যাবে।
জাফলং এর সৌন্দর্য বছরের একেক সময় একেক রকম হয়ে পর্যটকদের কাছে ধরা দেয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে জাফলং এর সতেজ প্রকৃতি ও পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
#৪. বিছানাকান্দি – সিলেট

বিছানাকান্দি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। বর্ষা মৌসুমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানকার পাথর কোয়েরি নদীর উপর স্বচ্ছ জলের ধারা দেখতে পর্যটকদের উপচে ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এছাড়া উঁচু পাহাড়ের উপর মেঘের ওড়াউড়ি দেখে আপনি মানসিক প্রশান্তি পাবেন। বিছানাকান্দি পাহাড়, পাথর কোয়েরি নদী ও ঝর্ণা সব মিলিয়ে প্রকৃতিকে অনন্য করে তুলেছে।
#৫. ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর – সিলেট

সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর একটি পাথর কোয়েরি। একপাশে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়, পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণা এবং অন্য পাশে পাথর কোয়েরি নদী ভোলাগঞ্জের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঝর্ণার পানির স্রোতে নদীতে নেমে আসে সাদা সাদা পাথর। সাদা পাথরের উপর দিয়ে বয়ে গেছে ধলাই নদ। প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বর্তমানে এটি জনপ্রিয় পর্যটন স্থান হয়ে উঠেছে।
#৬. সুন্দরবন – খুলনা রেঞ্জ

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশ সুন্দরবন। বর্ষা মৌসুমে সুন্দরবনের সবুজ প্রকৃতি আরো সবুজ হয়ে উঠে। রহস্যময় সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী ও পশুদের মধ্যে বাঘ ও হরিণ।
সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশ বন বিভাগ অনেক গুলো ট্যুরিস্ট স্পট তৈরি করেছেন। এর মধ্যে হিরণ পয়েন্ট, কটকা ও নীলকমল। এছাড়া সুন্দরবনের মধ্যে প্রকৃতিকভাবে থাকার জন্য বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় রিসোর্ট তৈরি করা হয়েছে।
#৭. নীলাচল – বান্দরবান

বান্দরবান শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ২ হাজার ফুট উচ্চতায় টাইগার পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র। বর্ষা ও শরৎ মৌসুমে সেখানে মেঘ ও পাহাড়ের খেলা দেখতে পাবেন। এছাড়া বৃষ্টি ভেজা পাহাড়, মেঘের ওড়াউড়ি ও কুয়াশা প্রকৃতিকে তৈরি করে এক স্বর্গীয় অনুভব।
পর্যটকদের সুবিধার জন্য এখানে বেশ কয়েকটি বিশ্রামাগার ও রিসোর্ট তৈরি করা হয়েছে। এই পর্যটন কেন্দ্র থেকে পুরো বান্দরবান শহর দেখতে পাবেন। মেঘের খেলা দেখতে সকাল সকাল এখানে চলে যাবেন।
#৮. শ্রীমঙ্গল চা বাগান – মৌলভীবাজার

বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী বলা হয় শ্রীমঙ্গলকে। এখানে প্রায় ৯২ টির মতো চা বাগান রয়েছে। পাহাড়ের ঢালে মাইলের পর মাইল সবুজ চা বাগান দেখে আপনার মনে হবে সবুজ গালিচা বিছানো। বর্ষা মৌসুমে সবুজ চা বাগানের সৌন্দর্য কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।
শ্রীমঙ্গল প্রবেশ পথে জেলা প্রশাসণের তৈরি “চা-কন্যা ভাস্কর্য” টি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। পর্যটকদের থাকার জন্য দেশের সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় রিসোর্ট গুলো শ্রীমঙ্গলে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া দেশের সবচেয়ে ভালো মানের চা এই শ্রীমঙ্গলের চা বাগান থেতে উৎপাদন হয়।
#৯. কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত – কক্সবাজার

১২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ও মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্থের জন্য প্রত্যেক বছর লক্ষ লক্ষ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগমন ঘটে কক্সবাজার। বিশেষ করে বর্ষাকালে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, গর্জন ও আশেপাশের সবুজ প্রকৃতি আপনাকে মুগ্ধ করবে।
#১০. কুয়াকাটা – পটুয়াখালী

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া থানার লতাচাপলি ইউনিয়নে অবস্থিত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত একই সাথে দেখা যায়।
পরিচ্ছন্ন বেলাভূমি, দিগন্তজোড়া সুনীল আকাশ, ম্যানগ্রুভ বন ও অনিন্দ্য সুন্দর সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে পর্যটকদের কাছে কুয়াকাটা সাগরকন্যা হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। বর্ষা মৌসুমে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের উত্তাল ঢেউ ও সমুদ্রের গর্জন শুনতে বহু পর্যটকের আগমন ঘটে।
বর্ষা মৌসুম বাংলার প্রকৃতি সতেজ মোহনীয় রূপ প্রকাশ করে। তাই বর্ষাকালে বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান সমূহ ঘুরে দেখতে আজই বেরিয়ে পড়ুন।





