নাটোর সদর জেলা শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে দিঘাপতিয়া রাজবাড়ী বা উত্তরা গণভবন (Uttara gonovobon) অবস্থিত। রাণী ভবানী তার নায়েব দয়ারাম রায়ের উপর সন্ত্তষ্ট হয়ে তাকে এই দিঘাপতিয়া পরগান উপহার দেন। পরবর্তীতে দয়ারাম রায় সেখানে কয়েকটি প্রাসাদ ঘড়ে তোলেন।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর দিঘাপতিয়া রাজা দেশত্যাগ করে কলকাতা চলে যান। এরপর ১৯৫০ সালে জমিদার অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাশ হওয়ার পর দিঘাপতিয়া রাজ প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা দেখা দেয়।
১৯৬৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়ের খানের বাসভবন হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ৯ই ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম পরিবর্তন করে “উত্তরা গণভবন” ঘোষণা করেন।
প্রায় ৪৩ একর আয়তনের রাজবাড়িতে মোট ১২ টি ভবন রয়েছে। এই ভবন গুলো হলো প্রধান প্রাসাদ ভবন, কুমার প্রাসাদ, প্রধান কাচারিভবন, ৩ টি কর্তারাণী বাড়ি, প্রধান ফটক রান্নাঘর, মোটরসাইকেল গ্যারেজ, ড্রাইভার কোয়ার্টার, স্টাফ কোয়ার্টার, কোষাগার ভবন ও সেন্ট্রি বক্স।
সকল ভবনের দরজা-জানালা মূল্যবান কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ রাজবাড়ি এলাকাটি একটি পরিখা ও উঁচু প্রাচীন দ্বারা বেষ্টিত। পূর্বপাশে চারতলা বিশিষ্ট পিরামিড আকৃতির প্রবেশ পথ রয়েছে। এটি উপরের দিকে সরু হয়ে ঘড়ি বিশিষ্ট টাওয়ারে শেষ হয়েছে।
প্রাসাদের ভিতর প্রবেশ করলে রাজার তলোয়ার, সিংহাসন ও বর্ম দেখতে পাবেন। রাজ প্রাসাদের বাগান সাজানোর জন্য রাজা দয়ারাম ইটালি থেকে দামিদামি আসবাবপত্র এনেছিল। বাগানের ভাস্কর্য তৈরি করার জন্য কলকাতা থেকে বেঞ্জগুলো আনা হয়েছিল।
মনোমুগ্ধকর বাগানে নীলমণিলতা, পারিজাত, সৌরভী, যষ্টিমধু, পেয়ালি, হাপরমালি, রাজ-অশোক, সৌরভী, হৈমন্তী, বনপুলক, কর্পূর, সেঁউতি, সাইকাস, তারাঝরা, মাধবী সহ আরো বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। এছাড়া রাজা প্রসন্ন্নাথের অবক্ষমূর্তি, চার কামান, জমিদার দয়ারামের ভাস্কর্ষ, কুমার ভবন, তহশিল অফিস ও অতিথিশালা রয়েছে।
উত্তরা গণভবন চত্বরে পদ্মপুকুর, গোলপুকুর, কাছারিপুকুর, কালীপুকুর, কেষ্টিপুকুর ও শ্যামসাগর নামে ৬ টি পুকুর রয়েছে। এছাড়া চারপাশে রয়েছে সুপ্রশস্ত পরিখা। প্রতিটি পুকুর পরিখায় শান বাঁধানো একাধিক ঘাট রয়েছে। গণভবন ঘিরে অসংখ্য আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, মেহগনি চন্দনা সহ বিভিন্ন জাতের গাছ রয়েছে।
উত্তরা গণভবন প্রবেশ মূল্য ও সময়সূচী
শীতকালে সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা ৫ টা পর্যন্ত এবং গ্রীষ্মকালে সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত উত্তরা গণভবন খোলা থাকে। প্রতি রবিবার গণভবন বন্ধু থাকে।
গণভবনে জনপ্রতি প্রবেশ টিকিট মূল্য ২০ টাকা।যেকোনো প্রয়োজনে ফোন করুন – নেজারত ডেপুটি কালেক্টর, নাটোর 01762-692122, 0771-66652.
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস ও ট্রেনে সরাসরি নাটোর যেতে পারবেন। নাটোর বাস স্টেশন বা রেলস্টেশন থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা করে গণভবন পর্যন্ত যেতে পারবেন। যেতে সময় লাগবে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। জনপ্রতি ভাড়া লাগবে ৩০ টাকা।
ঢাকা থেকে বাসে নাটোর
ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর বাস টার্মিনাল থেকে একাতা, হানিফ, শ্যামলী, দেশ ট্রাভেল, গ্রীণ লাইন, ন্যাশনাল পরিবহন সহ নাটোরগামী যেকোনো পরিবহনে করে নাটোর যেতে পারবেন। বাস ভেদে টিকিট মূল্য এসি ৯০০ টাকা থেকে ১,৩০০ টাকা এবং নন-এসি ৫৯০ টাকা।
ট্রেনে ঢাকা থেকে নাটোর
ঢাকার কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে বুড়িমারী এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস, চিলাহাটি এক্সপ্রেস, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, লালমনি এক্সপ্রেস, দ্রুতযান এক্সপ্রেস, নিলসাগর এক্সপ্রেস ও একতা এক্সপ্রেস ট্রেন গুলো নাটোর যাত্রা বিতরিত করে গন্তব্যে ছেড়ে যায়। ট্রেনের সিট ভেদে টিকিট মূল্য এসি বার্থ ১,৪৪৯ টাকা, এসি ৯৬৬ টাকা, স্নিগ্ধা ৮০৫ টাকা, শোভন চেয়ার ৪২০ টাকা।
কোথায় খাবেন
খাবার জন্য নাটোর শহরে অনেক রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে কুইন্স রেস্টুরেন্ট, সাদেক হোটেল, ইসলামিয়া পোচুর হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, নিউ নয়ন হোটেল ও বিসমিল্লাহ হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট উল্লেখযোগ্য।
নাটোর ভ্রমণে চলন বিল ও রাণী ভবানী সুস্বাদু মাছ, নাটোরের কাঁচাগোল্লা অবশ্যই খেয়ে আসবেন।
কোথায় থাকবেন
নাটোর থাকার জন্য অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে হোটেল ভি.আই.পি (01718-673735), হোটেল প্রিন্স (01746-029429), হোটেল মিল্লাত (01711-703346), নাটোর বোর্ডিং (0771-62001), উত্তরা মোটেল আবাসিক (01753-982566) উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া নাটোর জেলা পরিষদের ডাকবাংলো রয়েছে সেখানে থাকতে পারেন (077166932)। নাটোর আবাসিক হোটেল ভাড়া সহ বিস্তারিত তথ্য জানতে এই আর্টিকেলটি পড়ুন।
নাটোরের আরো দর্শনীয় স্থান সমূহ
উত্তরা গণভবন ছাড়াও আশেপাশে অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে গ্রীন ভ্যালী পার্ক, নাটোর রাজবাড়ি, চলন বিল, দয়ারামপুর জমিদার বাড়ি, হালতি বিল উল্লেখযোগ্য।





