সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে দেবহাটা উপজেলার শিবনগর ভারত সীমান্তে ইছামতি নদীর তীরে প্রায় ১৫০ বিঘা জায়গায় উপর গড়ে তোলা হয়েছে রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র (Ruposhi Debhata Mangrove Porjoton Kendra)। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি দেবহাটা মিনি সুন্দরবন বা দেবহাটা কেওড়া বাগান নামে পরিচিত।
দেবহাটার শীবনগর ইছামতি নদীর ভাঙ্গন রক্ষার কৃত্রিমভাবে এখানে গড়ে তোলা হয় কেওড়া বন। এই কেওড়া বন এখন জনগণের বিনোদন কেন্দ্র ও বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব আদায়ে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বর্তমান উপ-সচিব আ.ন.ম তরিকুল ইসলাম ২০১২ সালে এই কেওড়া বন গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর পরবর্তী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বর্তমান উপ-সচিব হাফিজ আল-আসাদ কেওড়া বনের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক উন্নয়ন করেন। এজন্য তাকে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে এটির উন্নয়ন কাজ করেছেন।
প্রবেশ টিকেট মূল্য ও সময়সূচী
রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশ টিকেট মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। গাড়ি পাকিং ২০ টাকা। এছাড়া পার্কের ভেতর বিভিন্ন রাইডের জন্য আলাদা টিকেট মূল্য রয়েছে।

সপ্তাহের ৭ দিন সকাল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র খোলা থাকে।
রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রে কি কি দেখবেন
দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশ করে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। রাস্তায় দুপাশে সুন্দর বসার স্থান রয়েছে, যেখানে বসে প্রিয় জনের সাথে গল্প ও ছবি তুলতে পারবেন।
এখানে সুন্দরবনের সুন্দরী, কেওড়া, গোলপাতা, বাইন, কাঁকড়া, নিম সহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ ও বনজ উদ্ভিদ রয়েছে। বনের ভেতর সুন্দরবনের আদলে তৈরি করা হয়েছে ট্রেইল ব্যবস্থা। যাতে বনের ভেতর দিয়ে সমগ্র বনটি উপভোগ করতে পারেন। বনের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় আপনি সুন্দরবনের ফিল পাবেন।
বনের পাশে প্রায় ৩০ বিঘা জায়গা জুড়ে বিশাল “অনামিকা লেক”। লেকে বিভিন্ন রঙের মাছ ও শান বাধানো পাঁকা ঘাট রয়েছে। লেকের পাশে কৃত্রিম সিংহ, জিরাফ, ঘোড়া, কুমির সহ বিভিন্ন ভার্ষস্ক তৈরি করা হয়েছে। লেকের মাঝখানে একটি কাঠের ঘর ও দৃষ্টিনন্দন একটি রেস্টুরেন্ট আছে। এছাড়া লেকের জলে বোড রাইডিং করতে পারবেন।
লেকের দক্ষিণ পাশে একটি মিনি চিড়িয়াখানা আছে। সেখানে বানর, উটপাখি, অজগর সাপ ও বিভিন্ন ধরনের পাখি রয়েছে। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে কিডস জোন। প্রিয় জনের সাথে ছবি তোলার জন্য রয়েছে সুন্দর সুন্দর সেলফি জোন। পার্কের সৌন্দর্য উপর থেকে উপভোগ করতে রয়েছে কেবলকার। কেবলকারে চড়তে জনপ্রতি ৫০ টাকা খরচ হবে।
পড়ন্ত বিকালে ইছামতির নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য নদীর পাড়ে সারি সারি ঝাউগাছের নিচে চেয়ার রয়েছে। চেয়ারে শুয়ে-বসে ইছামতী নদীর সৌন্দর্য ও জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখতে পারবেন। চাই নদীতে ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। নদীর ওপারে ভারত।
এছাড়া রয়েছে বিশ্রাম কক্ষ, পিকনিক স্পট, সেমিনার রুম, নামাজের স্থান, রান্নার স্থান, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন টয়লেট, পর্যাপ্ত বসার স্থান, ইন্টারনেট সুবিধা সহ বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা।
সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন বিকালে এখানে প্রচুর দর্শনার্থীদের আগমন ঘটে। শীত মৌসুমে এখানে চলে পিকনিক উৎসব। কয়েক মাস পিকনিকের আমেজ থাকে।
কিভাবে যাবেন
দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রে আসতে হলে প্রথমে আপনাকে সাতক্ষীরা জেলা সদর শহরে আসতে হবে। রাজধানী ঢাকার সাভার, গাবতলী, সায়েদাবাদ, কল্যাণপুর থেকে শ্যামলী পরিবহন, হানিফ পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, ইমাদ পরিবহন, সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস, টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস সহ অন্যান্য পরিবহনে চড়ে সরাসরি সাতক্ষীরা আসতে পারবেন। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে সাতক্ষীরা আসতে সময় লাগবে প্রায় ৫ ঘন্টা। জনপ্রতি ভাড়া নন-এসি ৭০০ টাকা এবং এসি ৯০০ টাকা।
সাতক্ষীরা জেলা শহর থেকে কালিগঞ্জগামী বাসে চড়ে সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ রোড়ের সখিপুর মোড়ে নেমে যাবেন। জনপ্রতি বাস ভাড়া ৬০ টাকা। সখিপুর মোড় থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে সরাসরি রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র যেতে পারবেন। ভাড়া লাগবে ২৫ থেকে ৩০ টাকা, দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার।
কোথায় থাকবেন
দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রে দর্শনীর্থীদের রাত্রিযাপন করার ব্যবস্থা নেই। তবে বিশ্রাম করার জন্য আলাদা রুম রয়েছে।
সাতক্ষীরা শহরে থাকার জন্য অনেক আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে হোটেল আল কাশেম (01709-964218), হোটেল টাইগার প্লাস (01799-184844), হোটেল সীমান্ত (01941-966781), হোটেল বৈশাখী (01922-302744), হোটেল সাতক্ষীরা প্যালেস (01934-272791) উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া মোজাফফর গার্ডেন এন্ড রিসোর্টে রাত্রিযাপন করতে পারেন। যোগাযোগ 01719-7690009. যাদের বাজেট বেশি তারা এখানে থাকতে পারেন।
কোথায় খাবেন
দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রের ভেতর দর্শনার্থীদের খাবার জন্য একটি রেস্টুরেন্ট আছে। সেখানে বিভিন্ন ফাস্ট ফুড সহ ভাত, মাছ, মাংস দিয়ে খেতে পারবেন। সংখ্যায় বেশি হলে আগেই খাবার অর্ডার দিবেন।
ভালো মানের খাবার খেতে চাইলে সাতক্ষীরা শহরের পানসি রেস্তোরাঁ, লেক ভিউ ক্যাফে, কাচ্চি ডাইন, আব্বাস হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, আহাদ হোটেল থেকে খেতে পারেন।
সাতক্ষীরার বিখ্যাত মিষ্টি সন্দেশ ও ক্ষীরসন্দেশ অবশ্যই স্বাদ নিবেন।
আশেপাশে দর্শনীয় স্থান
সাতক্ষীরা জেলার অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত, লেকভিউ ক্যাফে, কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক, সোনাবাড়িয়া মঠবাড়ি মন্দির, মোজাফফর গার্ডেন, নলতা শরীফ উল্লেখযোগ্য।





