বাংলাদেশের আনাচে-কানাচেতে অসংখ্য সুন্দর সুন্দর জমিদার বাড়ি আছে। যুগের পর যুগ ধরে এসব জমিদার বাড়িগুলো ইতিহাস ও অভিজাত্যের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এসব জমিদার বাড়ির সৌন্দর্য ও ইতিহাস অনেকের অজানা। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ১০ টি জমিদার বাড়ি হল বালিয়াটি জমিদার বাড়ি, মহেরা জমিদার বাড়ি, তাজহাট জমিদার বাড়ি, নাগরপুর জমিদার বাড়ি, হরিপুর জমিদার বাড়ি, পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি, করটিয়া জমিদার বাড়ি, উত্তরা গণভবন, দালাল বাজার জমিদার বাড়ি, কলসকাঠী জমিদার বাড়ি উল্লেখযোগ্য।
এসব জমিদার বাড়ি গুলোর ইতিহাস, ঐতিহ্য সহ বিস্তারিত ভ্রমণ গাইড নিচে আলোচনা করা হল।
বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ১০ টি জমিদার বাড়ি
(১) বালিয়াটি জমিদার বাড়ি
বালিয়াটি জমিদার বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গ্রামে অবস্থিত। ১৯ শতকে নির্মিত এই রাজবাড়ি মোট ৭ টি স্থাপনা নিয়ে তৈরি। রাজবাড়ির সবগুলো প্রাসাদ একসাথে বা একসময় তৈরি হয়নি। জমিদারের বিভিন্ন উত্তরাধিকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে স্থাপিত হয়েছিল। বর্তমানে এই রাজবাড়িটি বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত ও পরিচালিত।
(২) মহেরা জমিদার বাড়ি
মহেরা জমিদার বাড়ি বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরে অবস্থিত। ১৮৯০ সাল নাগাদ কলকাতার কালিচরণ সাহা ও আনন্দ সাহ এই অঞ্চলে এসে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্পেনের করডোভা নগরীর আদলে জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠিত করেন।
মহেরা জমিদার বাড়িতে প্রবেশ পথের আগে বিশাল একটি “বিশাখা সাগর” দীঘি এবং বাড়ির প্রবেশ পথে দুইটি সুরম্য গেট আছে। মূল ভবনের পিছনের দিকে পাসরা পুকুর ও রানী পুকুর নামে আরো দুইটি পুকুর আছে এবং বাড়ির সামনে রয়েছে ফুলের বাগান।
(৩) তাজহাট জমিদার বাড়ি
তাজহাট জমিদার বাড়ি রংপুর শহর জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে তাজহাটে অবস্থিত। এটি রংপুর বিভাগের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন, যা বর্তমানে একটি জাদুঘর হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহারাজ কুমার গোপাল লাল রায় তাজহাট জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। প্রায় ১০ বছর ধরে এই প্রাসাদটি নির্মান করেন। রাজবাড়িটি প্রায় ২১০ ফুট প্রশস্ত ও ৪ তলা বিল্ডিং এর সমান উঁচু। এর গঠনশৈলী প্রাচীন মুঘল স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত বলে ধারণা করা হয়। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ রাজবাড়িটি একটি সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা দেন।
(৪) নাগরপুর জমিদার বাড়ি
টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায় অবস্থিত নাগরপুর জমিদার বাড়ি। জমিদার যদুনাথ চৌধুরী প্রায় ৫৪ একর জায়গার উপর শৈল্পিক কারুকার্যমন্ডিত এই রাজবাড়ীটি নির্মাণ করেন। জমিদার বাড়ির দক্ষিণে প্রায় ১১ একর জায়গা জুড়ে “উপেন্দ্র সরোবর” নামে বিশাল একটি দিঘি আছে। বর্তমানে বাড়িটির মূল ভবনটি নাগরপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
(৫) হরিপুর জমিদার বাড়ি
ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হরিপুর জমিদার বাড়ি। ঘনশ্যাম কুন্ড ৩ একর ২৭ শতক জমির উপর এই জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। এক সময়ের দৃষ্টি নন্দন রাজ প্রাসাদটি অবহেলায় ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা।
(৬) পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি
টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায় অবস্থিত পাকুটিয়া জমিদার বাড়ি। ১৯৯৫ সালে প্রায় ১৫ একর জায়গার উপর রামকৃষ্ণ সাহা মন্ডল একই রকম নকশায় ৩ টি অট্রালিকা নির্মাণ করেন। তৎকালীন সময় জমিদার বাড়িটি তিন তরফ বা তিন মহলা নামে পরিচিত ছিল।
পাকুটিয়া জমিদার বাড়ির পাশে নাটমন্দির, কালীমন্দির ও বিশাল একটি দিঘী আছে। জমিদার বাড়ির তিন মহলের নিজস্ব বিশিষ্ট ও অপূর্ব লতাপাতার কারুকাজ আছে। বর্তমানে জমিদার বাড়িতে বি.সি.আর.জি. ডিগ্রী কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
(৭) করটিয়া জমিদার বাড়ি
টাঙ্গাইল জেলার করটিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত করটিয়া জমিদার বাড়ি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। জমিদার বাড়িটি করটিয়া রাজবাড়ী নামেও সুপরিচিত। জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী মোগল চৈনিক স্থাপত্য কৌশলে বাড়িটি নির্মাণ করেন।
জমিদার বাড়িতে আছে লোহার ঘর, রাণীর পুকুরঘাট, রোকেয়া মহল, ছোট তরখ দাউদ মহল ও মোগল স্থাপত্যে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। জমিদার বাড়ির চারপাশে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।
(৮) উত্তরা গণভবন
নাটোর জেলা শহর থেকে মাত্র ২.৪ কিলোমিটার দূরে উত্তরা গণভবন বা দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ি অবস্থিত। বর্তমানে এটি উত্তরাঞ্চলের গভর্মেন্ট হাউস নামে পরিচিত। ১৯৭২ সনের ৯ ফেব্রুয়ারি শেখ মজিবুর রহমান দিঘালিপাতিয়া রাজবাড়িকে উত্তরা গণভবন নামকরণ করেন।
প্রায় ৪৩ একর জায়গার উপর গড়ে তোলা রাজবাড়িটিতে মোট ১২ টি ভবন আছে। উত্তরা গণভবনের প্রবেশপথে চূড়ায় বিখ্যাত কোক অ্যান্ড টেলভি কোম্পানির তৈরি একটি ঘড়ি স্থাপন করা আছে। রাজ প্রাসাদের সামনে ইতালি থেকে সংগৃহীত ভাস্কর্য ও সুসজ্জিত বাগান আছে। মূল ভবনে প্রবেশ করলে রাজার সিংহাসন, বর্মা ও তলোয়ার দেখতে পাবেন।
সময়সূচিঃ সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত উত্তরা গণভবন খোলা থাকে। প্রতি রবিবার উত্তরা গণভবন বন্ধ থাকে। প্রবেশ টিকেট মূল্য ২০ টাকা।
(৯) দালাল বাজার জমিদার বাড়ি
লক্ষীপুর জেলার সদর উপজেলার দালাল বাজার নামক স্থানে অবস্থিত দালাল বাজার জমিদার বাড়ি।ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটি প্রায় পাঁচ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রায় চারশত বছর আগে লক্ষী নারায়ণ বৈষ্ণব এই জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। রাজবাড়িতে প্রবেশপথে রাজকীয় প্রবেশদ্বার, প্রাসাদ, অন্দরমহল ও শান বাঁধানো পুকুর আছে।
(১০) কলসকাঠী জমিদার বাড়ি
কলসকাঠী জমিদার বাড়ি বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। প্রায় ৩ শতক আগে জানকী বল্লভ রায় চৌধুরী এই জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠিত করেন। এখানে বেশ কয়েকটি মন্দির আছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জমিদার বাড়িটি বর্তমানে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।





