অস্ট্রেলিয়ার সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান

কল্পনা করুন, আপনি দিগন্তজোড়া নীল সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, আর আপনার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপত্যশৈলীর এক বিস্ময় সিডনি অপেরা হাউস। অথবা ভাবুন, আপনি পানির নিচে রঙিন কোরাল বা প্রবাল প্রাচীরের এক মায়াবী রাজ্যে হারিয়ে গেছেন। শুনতে স্বপ্নের মতো মনে হলেও, অস্ট্রেলিয়া এমন এক দেশ যেখানে প্রকৃতি এবং আধুনিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। আপনি যদি বাংলাদেশ থেকে একটি দুর্দান্ত বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ভালো গন্তব্য আর কী হতে পারে?

আজকের এই ভ্রমন ব্লগে আমি আপনাদের নিয়ে যাব ক্যাঙ্গারুর দেশ অস্ট্রেলিয়ার সেই সব জাদুকরী স্থানে, যা আপনার ভ্রমণ ডায়েরিকে করে তুলবে অনন্য। তাহালে চুলন ঘুরে আসি অস্ট্রেলিয়ার সেরা কিছু দর্শনীয় স্থান থেকে।

এক নজরে সম্পূর্ণ লেখা

অস্ট্রেলিয়ার প্রধান আকর্ষণ সিডনি ও এর আশপাশ

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের কথা বললে সবার আগে যে শহরটির নাম মাথায় আসে, তা হলো সিডনি। এটি কেবল একটি শহর নয়, বরং পর্যটকদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। সিডনিতে পা রাখলেই আপনি বুঝতে পারবেন কেন একে বিশ্বের অন্যতম বাসযোগ্য শহর বলা হয়।

BM Khalid Hasan Sujon

সিডনি অপেরা হাউস ও হারবার ব্রিজ

সিডনি অপেরা হাউসকে বলা হয় অস্ট্রেলিয়ার আইকন। এর পাল তোলা নৌকার মতো নকশাটি দূর থেকে দেখলে আপনার মনে হবে যেন কোনো শিল্পী ক্যানভাসে ছবি এঁকে রেখেছেন। আপনি চাইলে এর ভেতরে ঢুকে অপেরা দেখতে পারেন অথবা বাইরে থেকে ছবি তুলে স্মৃতি ধরে রাখতে পারেন। অপেরা হাউসের ঠিক পাশেই রয়েছে সিডনি হারবার ব্রিজ। স্থানীয়রা একে ভালোবেসে ‘কোট হ্যাঙ্গার’ বলে ডাকেন। আপনি যদি একটু সাহসী হন, তবে ব্রিজের একদম উপরে চড়তে পারেন, যেখান থেকে পুরো শহরের এক প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়।

বন্ডাই বিচ

আপনি কি সমুদ্র ভালোবাসেন? তাহলে বন্ডাই বিচ আপনার জন্য মাস্ট-ভিজিট। সিডনির এই সমুদ্র সৈকতটি তার সোনালী বালু আর নীল পানির জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। এখানে আপনি সার্ফিং করতে পারেন অথবা সৈকতের ধারের ক্যাফেগুলোতে বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে অস্ট্রেলিয়ান লাইফস্টাইল উপভোগ করতে পারেন। বাংলাদেশিদের জন্য এই সৈকতটি বেশ রোমাঞ্চকর হতে পারে কারণ আমাদের দেশের কক্সবাজারের চেয়ে এর পরিবেশ একদমই ভিন্ন।

গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ

অস্ট্রেলিয়া যাবেন আর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ দেখবেন না, তা তো হতেই পারে না! এটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীর এবং মহাকাশ থেকেও এটি দেখা যায়। কুইন্সল্যান্ড উপকূলে অবস্থিত এই স্থানটি জলজ প্রাণীদের এক বিশাল আধার।

স্কুবা ডাইভিং

আপনি যদি পানির নিচের জগত দেখতে ভালোবাসেন, তবে এখানে স্কুবা ডাইভিং করতে ভুলবেন না। হাজার হাজার রঙের মাছ, কচ্ছপ এবং সামুদ্রিক উদ্ভিদ আপনাকে এক অন্য পৃথিবীতে নিয়ে যাবে। যারা সাঁতার জানেন না, তাদের জন্য রয়েছে কাঁচের তলাযুক্ত বোট, যেখান থেকে ভিজে না গিয়েই প্রবাল প্রাচীর দেখা সম্ভব।

BM Khalid Hasan Sujon

হুইটসানডে দ্বীপপুঞ্জ

গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত হুইটসানডে দ্বীপপুঞ্জটি যেন পৃথিবীর এক টুকরো জান্নাত। এখানকার ‘হোয়াইটহ্যাভেন বিচ’ তার ধবধবে সাদা বালুর জন্য পরিচিত। আপনি এখানে ক্রুজ শিপে করে ঘুরতে পারেন অথবা ব্যক্তিগতভাবে ইয়ট ভাড়া করে নির্জনে সময় কাটাতে পারেন।

মেলবোর্ন

সিডনি যদি হয় অস্ট্রেলিয়ার গ্ল্যামার, তবে মেলবোর্ন হলো দেশটির সাংস্কৃতিক রাজধানী। এখানকার ক্যাফে কালচার, স্ট্রিট আর্ট এবং স্পোর্টস উন্মাদনা আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

গ্রেট ওশান রোড ও টুয়েলভ অ্যাপোস্টেলস

মেলবোর্ন থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন গ্রেট ওশান রোডের দিকে। এটি বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ড্রাইভওয়ে। সমুদ্রের পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আপনি দেখতে পাবেন ‘টুয়েলভ অ্যাপোস্টেলস’ বা বারো জন ধর্মপ্রচারক নামক বিশাল সব চুনাপাথরের স্তম্ভ, যা সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও সময়ের বিবর্তনে এখন আর বারোটি স্তম্ভ অবশিষ্ট নেই, তবুও এর সৌন্দর্য আপনাকে বাকরুদ্ধ করে দেবে।

মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড

আমরা বাংলাদেশিরা ক্রিকেট পাগল জাতি। তাই মেলবোর্নে গিয়ে এমসিজি বা মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড না দেখলে আপনার সফর অপূর্ণ থেকে যাবে। ১৯৫৬ সালের অলিম্পিক এবং দুটি বিশ্বকাপ ফাইনালের সাক্ষী এই স্টেডিয়ামটি ঘুরে দেখা যে কোনো ক্রিকেট ভক্তের জন্য স্বপ্নের মতো।

BM Khalid Hasan Sujon

অস্ট্রেলিয়ার বন্যপ্রাণী ও আউটব্যাক অভিজ্ঞতা

অস্ট্রেলিয়া মানেই ক্যাঙ্গারু আর কোয়ালার দেশ। তবে এর বাইরেও দেশটির বিশাল মরুভূমি বা ‘আউটব্যাক’ অঞ্চলে লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য।

আয়ার্স রক

অস্ট্রেলিয়ার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত আয়ার্স রক বিশাল লাল রঙের পাথরটি আদিবাসীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলোর সাথে সাথে এই পাথরের রঙ পরিবর্তন হয়। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় আয়ার্স রক দেখতে সবচেয়ে সুন্দর লাগে। এখানে গেলে আপনি অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবেন।

ব্লু মাউন্টেনস ন্যাশনাল পার্ক

সিডনি থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত ব্লু মাউন্টেনস ন্যাশনাল পার্ক পাহাড়টি ইউক্যালিপটাস গাছের তেলের বাষ্পের কারণে দূর থেকে নীল দেখায়, তাই এর নাম ব্লু মাউন্টেনস। এখানকার ‘থ্রি সিস্টার্স’ নামক পাথরের চূড়া তিনটি পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। এখানে হাইকিং করার পাশাপাশি ক্যাবল কারে চড়ে পুরো উপত্যকার দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের সেরা সময় ও ভ্রমণ পরিকল্পনা

বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে আবহাওয়া সম্পর্কে জেনে নেওয়া জরুরি। কারণ আমাদের দেশে যখন গ্রীষ্মকাল, ওখানে তখন শীতকাল।

মাসঋতুকেন যাবেন
ডিসেম্বর – ফেব্রুয়ারিগ্রীষ্মকালসমুদ্র সৈকত এবং উৎসবের জন্য সেরা।
মার্চ – মেশরৎকালমনোরম আবহাওয়া এবং দর্শনীয় স্থানের ভিড় কম থাকে।
জুন – আগস্টশীতকালস্কিইং করতে চাইলে বা কুইন্সল্যান্ড ভ্রমণে আরামদায়ক।
সেপ্টেম্বর – নভেম্বরবসন্তকালপ্রকৃতি যখন ফুলে ফুলে ভরে ওঠে।

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণে প্রয়োজনীয় টিপস

অস্ট্রেলিয়া বেশ বড় একটি দেশ, তাই অল্প সময়ে সব ঘুরে দেখা সম্ভব নয়। আপনার ভ্রমণের পরিকল্পনা সহজ করতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে পারেন:

ভিসা প্রসেসিং

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ভিজিটর ভিসা প্রয়োজন হয়। এটি অনলাইনে আবেদন করা যায়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন ব্যাংক স্টেটমেন্ট, পেশার প্রমাণপত্র এবং ভ্রমণের পরিকল্পনা সঠিকভাবে জমা দিলে ভিসা পাওয়া সহজ হয়।

অস্ট্রেলিয়ার ভিসা পাওয়া কি খুব কঠিন

না, যদি আপনার নথিপত্র সঠিক থাকে এবং আপনি প্রমাণ করতে পারেন যে ভ্রমণ শেষে আপনি বাংলাদেশে ফিরে আসবেন, তবে ভিসা পাওয়া খুব একটা কঠিন নয়।

যাতায়াত ব্যবস্থা

অস্ট্রেলিয়ার এক শহর থেকে অন্য শহরের দূরত্ব অনেক বেশি। তাই সময় বাঁচাতে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে যাতায়াত করা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে যদি বাজেট কম থাকে এবং সময় বেশি থাকে, তবে ট্রেন বা বাস ব্যবহার করতে পারেন।

খাবারের ব্যবস্থা

অস্ট্রেলিয়ায় প্রচুর বাংলাদেশি এবং ভারতীয় রেস্টুরেন্ট আছে। বিশেষ করে সিডনি এবং মেলবোর্নে আপনি সহজেই দেশি স্বাদের খাবার খুঁজে পাবেন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সিফুড এবং ‘অজি বারবিকিউ’ অবশ্যই ট্রাই করবেন।

প্রশ্ন-উত্তর (FAQ)

অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণে কত টাকা খরচ হতে পারে?

এটি নির্ভর করে আপনার থাকার ধরণ এবং কতদিন থাকবেন তার ওপর। তবে মোটামুটিভাবে ১০-১৫ দিনের একটি সফরের জন্য জনপ্রতি ৪ থেকে ৬ লক্ষ টাকা (ভিসা ও বিমান ভাড়া সহ) বাজেট রাখা ভালো।

বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ফ্লাইট আছে কি?

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই। তবে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স বা এমিরেটস-এ করে ট্রানজিট নিয়ে সহজে যাওয়া যায়।

ক্যাঙ্গারু কোথায় দেখা যাবে?

অস্ট্রেলিয়ার প্রায় সব বড় শহরের চিড়িয়াখানায় ক্যাঙ্গারু দেখা যায়। তবে বন্য পরিবেশে দেখতে চাইলে ক্যানবেরা বা ভিক্টোরিয়ার গ্রাম্য এলাকাগুলোতে যেতে পারেন।

আরো পড়ুন

ইতালির দর্শনীয় স্থান
সুইজারল্যান্ড এর দর্শনীয় স্থান
কানাডার দর্শনীয় স্থান