দীপশিখা স্কুল (Dipshikha School) বাংলাদেশের একটি ভিন্নধর্মী বিদ্যানিকেতন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার মঙ্গলপুর ইউনিয়নের রুদ্রপুর গ্রামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকার ১৯৯৯ সালের ১ লা সেপ্টেম্বর দীপশিখা নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মেটি স্কুল গড়ে তোলে। তবে এই স্কুলের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বর্তমানে এই স্কুলে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়।
রুদ্রপর গ্রামের স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্য ও পরিচয় বহন করে এই দীপশিখা মেটি স্কুল। ঐসময় রুদ্রপুর গ্রামে কোনো স্কুল না থাকায় প্রায় সাত কিলোমিটার পথ হেঁটে গ্রামের শিশুদের স্কুলে যেতে হতো। এজন্য অনেকেই পড়াশোনা বাদ দিয়ে কৃষি কাজে জড়িয়ে পড়েন।
২০০২ সালে রুদ্রপুর গ্রামে গবেষণার জন্য অস্ট্রেলিয়ার লিজ ইউনিভার্সিটি থেকে দশ জন শিক্ষার্থী আসেন। গবেষণা শেষ করে তারা দেশে ফিরে গেলেও অ্যানা হেরিঙ্গার তার গবেষণা ও স্থাপত্যবিদ্যা কাজে লাগিয়ে গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসারের লক্ষ্যে একটি স্কুল তৈরির পরিকল্পনা করেন।
তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এগিয়ে আসেন জার্মানির উন্নয়ন সংস্থার আধুনিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট এবং বাংলাদেশের বেসরকারি সেবা সংস্থা দীপশিখা। এদের যৌথ উদ্যোগে দীপশিখা মেটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় কাচামাল বাঁশ, কাঠ, দড়ি, মাটি, খড়, টিন, রড়, ইট, বালু, সিমেন্ট ইত্যাদি দিয়ে দীপশিখা মেটি স্কুল নির্মিত। মাটি ও খড় মেশানো কাদা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে স্কুলের দেয়াল, দেয়ালের ভিতরে ওপরে দেওয়া হয়েছে আর্দ্রতারোধক। ইমারতটির দেয়ালের প্লাস্টারে মাটি ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে।
মেঝে প্লাস্টারের জন্য পামওয়েল ও সাবানের পেস্ট ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ইমারতটির বাহিরে প্লাস্টার করা হয়নি। ইমারতটির ৯ ফুট উচ্চতায় প্রথম তলায় ছাদ হিসেবে বাঁশ বিছিয়ে বাঁশের চাটাই দিয়ে মাটির আবরণ দেওয়া হয়েছে।
১০ ফুট উচ্চতার ওপরে দোতালার ছাদে বাঁশের সাথে কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি প্রতিরোধের জন্য টিন ব্যবহার করা হয়েছে। স্কুলের কাঠামো তৈরিতে ইট ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরির জন্য শীতের দিনে গরম ও গরমের দিনে ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা আছে। নিচের তলায় শিশুদের খেলাধুলা করার জন্য খেলাঘর রয়েছে। শিশুদের পাঠ দানের পাশাপাশি নাচ, গান, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন ও ইংরেজি ভাষা শিখানো হয়।
মাটির তৈরি আট হাজার বর্গফুট দোতলা ভবনটি নির্মাণে ব্যায় করা হয়েছে ১৭ লাখ টাকা। ভবনটির নির্মাণে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার দশজন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় ১৯ জন শ্রমিক যুক্ত ছিলেন। ইমারতটি ২০০৮ সালে আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার ও ২০০৯ সালে নকশার জন্য কারি স্টোন নকশা পুরস্কারে ভূষিত হয়।
দীপশিখা স্কুল কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে চড়ে খুব সহজে দিনাজপুর যেতে পারবেন। ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে দিনাজপুরগামী নাবিল পরিবহন, এস এ পরিবহন, এস আর ট্রাভেলস, হানিফ পরিবহন, কেয়া পরিবহন, বাবলু এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন ইত্যাদি বাসে চড়ে দিনাজপুর যেতে পারবেন। নন-এসি ও এসি বাস ভেদে জনপ্রতি ভাড়া ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা।
এছাড়া কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে আন্তঃনগর দ্রুতযান এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনে দিনাজপুর যেতে পারবেন। শ্রেণীভেদে ভাড়া ৬৩০ টাকা থেকে ২,২১৮ টাকা।
দিনাজপুর শহর থেকে লোকাল বাসে চড়ে বিরল উপজেলার রুদ্রপুর নেমে সিএনজি বা অটোরিকশা অথবা পায়ে হেঁটে দীপশিখা স্কুলে যেতে পারবেন।
কোথায় খাবেন
দিনাজপুর শহর খাবার জন্য বাংলা, থাই, চাইনিজ ও ফাস্টফুডের অনেক হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সোনারগাঁও, রুস্তম, দিলকুশা ও আহার রেস্তোরাঁ। এসব হোটেল ও রেস্তোরাঁ থেকে পছন্দের খাবার খেতে পারবেন।
কোথায় থাকবেন
দিনাজপুর শহরে থাকার জন্য ভালো মানের অনেক হোটেল-মোটেল রয়েছে। দিনাজপুর অবস্থিত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেলে অগ্রিম বুকিং (0531-64718, 9899288-91) দিয়ে থাকতে পারেন। পর্যটন মোটেলে প্রতি রাতের ভাড়া ১,৫০০ থেকে ২,২০০ টাকা।
এছাড়া দিনাজপুর শহর অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে হোটেল ডায়মন্ড (0531-64629), হোটেল আল রশিদ (0531-64251), নিউ হোটেল (0531-68122), হোটেল নবীন (0531-64178), হোটেল রেহানা (0531-64414) উল্লেখযোগ্য।
আশেপাশের দর্শনীয় স্থান
দীপশিখা স্কুল ছাড়াও দিনাজপুর জেলায় আরো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে রামসাগর দীঘি, কান্তজির মন্দির, নয়াবাদ মসজিদ, সুরা মসজিদ, স্বপ্নপুরী পিকনিক স্পট উল্লেখ্যযোগ্য।





