লন্ডনের দর্শনীয় স্থান

বর্তমানে পৃথিবীতে বৈচিত্র্যময় যতগুলো প্রাচীন ও আধুনিক শহর আছে লন্ডন তার মধ্যে অন্যতম। এই শহরের চোখ জুড়ানো স্থাপনা পর্যটকদের নজর কাড়ে। বৈচিত্র্যময় এই শহরের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতির মানুষ বসবাস করে। তাই স্বাভাবিকভাবে এখানে বৈচিত্র্যময় সব খাবার পাওয়া যায়।

লন্ডন কতটা বৈচিত্র্যময় সেটা আপনি এখানে না ঘুরলে বুঝতে পারবেন না। লন্ডনের দর্শনীয় স্থান সমূহ ঘুরে দেখতে হলে লম্বা সময় নিয়ে যেতে হবে। আমার ৭ দিনের লন্ডন ভ্রমণে লন্ডন শহরের বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থানে ঘুরে দেখেছি।

দিনের লন্ডন, রাতের লন্ডন ও রকমারি খাবার যেকোনো পর্যটকে মুগ্ধ করবে। এজন্যই বিশ্বের পর্যটকরা সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করে যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরে।

লন্ডনের দর্শনীয় স্থান সমূহ

চলুন ইংল্যান্ডের রাজধানী ও সবচেয়ে বড় শহর লন্ডনের সেরা দর্শনীয় স্থান সমূহ ঘুরে দেখে আসি।

টাওয়ার ব্রিজ

লন্ডনের সবচেয়ে জনপ্রিয় টেমস নদীর উপর টাওয়ার ব্রিজ রাজকীয় লন্ডনের আভিজাত্যের প্রতীক। ব্রিজের রূপ একেক দিন একেক রকম। দিনের একটি সময় খুলে দেওয়া হয় টাওয়ার ব্রিজ। অবশ্যই টিকেট কেটে এই ব্রিজ দেখতে হয়।

বহু সিনেমার শুটিংয়ে আমি এই ব্রিজ দেখেছি। আজ নিজ চোখে দেখে আমি সত্যিই শিহরিত। আগে এখানে কাঠের তৈরি ব্রিজ ছিল। যা তৈরি করেছিলেন রোমান প্রতিষ্ঠাতারা। বর্তমানের এই টাওয়ার ব্রিজটি কংক্রিট ও লোহার তৈরি একটি বক্স গার্ডার ব্রিজ। এটি ১৯৭৩ সালে খুলে দেওয়া হয়।

লন্ডন আই

লন্ডনের অন্যতম পর্যটন স্থাপনা গুলোর মধ্যে লন্ডন আই একটি। বিশাল বড় চাকার মতো গোলাকার এই রাইডে উঠলে ৩৬০ ডিগ্রি প্যানারোমিক ভিউতে পুরো লন্ডন শহর দেখতে পাবেন। গোলকার এই রাইডে মোট ৩২ টি ক্যাপসুল আছে, যার একেকটির ওজন প্রায় ১০ টন।

৩২ টি ক্যাপসুল বৃহত্তর লন্ডনের ৩২ টি উপশহরের প্রতিনিধিত্ব করে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই ক্যাপসুলে ২৫ জন পর্যন্ত দর্শনার্থী বসতে পারে।

রাতে টেমস নদীর আশেপাশের ল্যাম্পপোষ্টগুলো জ্বলে উঠলে লন্ডন আই এর চারপাশে বিভিন্ন রকমের আলো দেখা যায়। রাতের বিভিন্ন রকমের আলোতে পুরো লন্ডনের চেহারা বদলে যায়। লন্ডন আইয়ের আশেপাশে হরেকরকমের ছোট-বড় খাবারের দোকান আছে।

বাকিংহাম প্যালেস

পৃথিবীতে যতগুলো বড় দৃষ্টিনন্দন রাজপ্রাসাদ আছে বাকিংহাম প্যালেস তার মধ্যে অন্যতম। অনেক দূর থেকে দেখা যায় এই রাজপ্রাসাদটি। কাছে গেলে দেখতে পাবেন দর্শানার্থীদের ভিড় ও ছবি তোলার হিড়িক।

বিশাল এই রাজপ্রাসাদের মূল ফটক সবসময় বন্ধ থাকে। ভেরতে লাল পোশাক আর কালো টুপি পরা প্রহরীদের সশস্ত্র পাহারা। দৃষ্টিনন্দন রাজপ্রাসাদ ও শ্বেতপাথরে নজরকাড়া ভাস্কর্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিভিন্ন রাজকীয় অনুষ্ঠান ও অবসরকালীন বিনোদনের জন্য এটি তৈরি করা হয়। আপনারা যারা লন্ডন ভ্রমণে আসবেন তারা অবশ্যই এই রাজপ্রাসাদ দেখে যাবেন।

হাইড পার্ক

হাইড পার্ক লন্ডনের বৃহত্তর রয়্যাল পার্ক। এখানে আসলে দেখতে পাবেন বড় বড় সারি সারি গাছ, বসার বেঞ্চ, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা সব মিলিয়ে দারুণ লাগবে। এখানে শুধু ঘুরতে আসে না, অনেক আসে হাঁটতে, সাইকেল চালাতে, বসে আড্ডা দিতে।

বসন্তে পার্কটি চিরসবুজ দেখায়, হেমন্তে গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝড়ে পড়ে। হাইড পার্কের ভেতরে বড় একটি লেক আছে। যেখানে হাঁসের সাথে ফ্লেমিগো ভেসে বেড়াচ্ছে। এছাড়া লেকের পাড়ে কয়েক প্রজাতির প্রজাপতি, কবুতর ও পাখি দেখতে পাবেন।

ব্রিটিশ জাদুঘর

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাদুঘর গুলোর মধ্যে ব্রিটিশ জাদুঘর একটি। পুরো পৃথিবীর মানুষের সংস্কৃতির প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ নিদর্শন আছে এই জাদুঘরে। এখানে আমেরিকা, মিশর, গ্রিস, চীন, রোম, প্রাচীন ভারতের সংগৃহীত বস্তু ও প্রত্নসামগ্রীও আছে।

১৭৫৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানী স্যার হ্যান্স স্লোয়েনের সংগৃহীত জিনিসপত্রের মাধ্যমে এই জাদুঘরের সূচনা হয়। প্রথমে তিনি ৭১ হাজারের বেশি বস্তুসামগী সংগ্রহ রেখেছিলেন জাদুঘরে। এর মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি বই, ৭ হাজার পাণ্ডুলিপি ও ৩৩৭ প্রজাতির উদ্ভিদ দেহাবশেষ।

বর্তমানে এখানে টিপু সুলতানের তলোয়ার, মিসরীয় রাজাদের মমি সহ আরো ঐতিহাসিক বস্তুু আছে। ব্রিটিশ জাদুঘরে প্রবেশ করতে টিকেট মূল্য প্রদান করতে হয় না, তবে আপনি জাদুঘরে টাকা দান করতে পারবেন।

অক্সফোর্ড স্ট্রিট

ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের আভিজাত্য দেখতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে অক্সফোর্ড স্ট্রিট। এখানে শত বছরের সব উঁচু উঁচু ভবন, স্থাপনা ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পোশাক ও খাবারের দোকানের জন্য অক্সফোর্ড স্ট্রিটের বিশেষ সুনাম আছে।

সন্ধ্যার পর এই এলাকায় মানুষের সমাগম বৃদ্ধি পায়। আপনার মনে হবে আপনি কোনো ভিন্ন জগতে আছেন। সবাই অফিস শেষ করে এখানে মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরে। এখানে রয়েছে বিশ্ব সংবাদমাধ্যম বিবিসি এর অফিস।

এখানকার চারপাশের বড় বড় দোকান গুলো দেখতে দেখতে আমার চোখের সামনে হঠাৎ পড়লো “মেড ইন বাংলাদেশ” একটি দোকান। দোকানটি দেখে আমার মন গর্ভে ভরে গেল।

ছোট ভেনিস

ইতালির ভেনিস শহরের কথা আমাদের সকলের জানা আছে। কিন্তু আপনি কি কখনো শুনছেন লন্ডনে ছোট ভেনিস নামে একটি স্থান আছে? ইতালির ভেনিস শহরের মতো এখানে লেকে দেখতে পাবেন বিভিন্ন রঙের সুদৃশ্য ছোট নৌকা। দর্শনার্থীরা নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

লেকের দুপাশে গাছ, গাছে সবুজ আপেল ধরছে। স্মল ভেনিসের পাশে দৃষ্টিনন্দন একটি বড় গীর্জা আছে। সেখানে অনেক প্রাথনা করছে।

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট ভবন

যুক্তরাজ্যের উঁচু দৃষ্টিনন্দন পার্লামেন্ট ভবনটি সহজে মানুষের দৃষ্টি আর্কষন করে। অনুমতি নিয়ে এখানে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এখানে প্রবেশ করার অনুমতি পাওয়া কঠিন। ভেতরে এখানে সেখানে বেশ কয়েকটি ভাস্কর্ষ আছে। আছে বিশাল একটি লন।

লন্ডন ভ্রমণের সহজ উপায়

কারো সাহায্য না নিয়ে আপনি গুগল ম্যাপের মাধ্যমে খুব সহজে লন্ডনের দর্শনীয় স্থান সমূহ ঘুরে ঘুরে দেখতে পারবেন। Google map আপনার গন্তব্য দিলে কিভাবে যেতে হবে, ট্রেনে বা বাসে কিসে যেতে হবে, কত সময় লাগবে সব কিছু দেখতে পাবেন। এমনকি কত সময় পরপর বাস ট্রেন আসতে সেটাও দেখতে পাবেন।

লন্ডন ভ্রমণে সব সময় কাছে ছাতা রাখবেন। কারণ লন্ডনের আবহাওয়া হঠাৎ রোদ হঠাৎ বৃষ্টি। ওয়েস্টার কার্ড কিনে টাকা লোড করে রাখবেন। না হলে বাস ট্রেন চড়তে পারবেন না। আর যদি কোনো সমস্যার সম্মুখীন হন তাহলে কাউকে জিজ্ঞেস করলে অবশ্যই সহায়তা পাবেন।

এছাড়া লন্ডন ভ্রমণের অনেক ট্যুরিস্ট এজেন্সি আছে যাদের মাধ্যমে ইংল্যান্ড ভ্রমণ করতে পারবেন।

আরো পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *