রামসাগর দীঘি ও জাতীয় উদ্যান, দিনাজপুর

রামসাগর দীঘি (Ramsagar Dighi) বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে তাজপুর গ্রামে অবস্থিত। এটিকে বাংলাদেশের বৃহত্তম মানবসৃষ্ট দীঘি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তটভূমিসহ দীঘির আয়তন ৪,৩৭,৪৯২ বর্গমিটার, পাড়ের উচ্চতা ১০.৭৫ মিটার এবং গভীরতা গড়ে ১০ মিটার।

ঐতিহাসিকদের মতে ১৭২২ থেকে ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে দিনাজপুরের রাজা রামনাথ রামসাগর দীঘি খনন করেন। দীঘি খনন করতে প্রায় ১৫,০০,০০০ শ্রমিক কাজ করেন এবং তৎকালীন প্রায় ৩০,০০০ টাকা খরচ হয়। রাজা রামনাথের নামানুসারে এই দীঘির নামকরণ করা হয় রামসাগর।

নামে এটি সাগর মনে হলেও এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট দীঘি। ১৯৬০ সালে রামসাগর বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আসে। এরপর ১৯৯৬ সালে এই দীঘিকে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল রামসাগরকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

কথিত আছে ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে প্রচন্ড খরা দেখা দিলে হাজার হাজার প্রজা পানির অভাব বোধ করে। প্রজাদের পানির চাহিদা মেটাতে রাজা প্রাণনাথ মাত্র ১৫ দিনে বিশাল এই দীঘি খনন করেন। কিন্ত দীঘিতে পানি না ওঠায় রাজা স্বপ্নে দেখেন তার একমাত্র পুত্র রামকে দীঘিতে বলি দিলে পানি উঠবে।

এরপর রাজা দীঘির মধ্যেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করেন এবং রামকে একদিন সকালে হাতির পিঠে করে  দীঘির দিকে নিয়ে যায়। দীঘির পাড়ে পৌঁছে রাম সিঁড়ি দিয়ে নেমে মন্দিরে প্রবেশ করার সাথে সাথে দীঘিতে পানি উঠতে শুরু করে এবং বিশাল দীঘি পানিতে ভরে যায়।

অপর লোককাহিনী অনুযায়ী দীঘি খনন করার পর পানি না উঠায় রাজা স্বপ্নে দেখেন দীঘিতে কেউ প্রাণ বিসর্জন দিলে পানি উঠবে। তখন রাম নামের স্থানীয় একজন যুবক দীঘিতে প্রাণ বিসর্জন দেয়। সেই থেকে এই দীঘির নামকরণ করা হয় রামসাগর।

রামসাগর দীঘি জাতীয় উদ্যানে কি কি দেখবেন

রামসাগর জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ৭ টি পিকনিক স্পট, ১ টি ক্যাফেটেরিয়া, ২ টি টয়লেট, শিশুপার্ক, বিভিন্ন রাইড ও মিনি চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানায় রয়েছে হরিণ, বানর, অজগর সাপ সহ নানা ধরনের প্রাণী।

রামসাগর জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ টিকেট মূল্য ২০ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন রাইডের জন্য আলাদা ফি আছে। ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর ৮০০ বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে রামসাগর গ্রন্থাগার নামে একটি অনুমোদনহীন পাঠাগার গড়ে তোলা হয়।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে চড়ে খুব সহজে দিনাজপুর যেতে পারবেন। ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে দিনাজপুরগামী নাবিল পরিবহন, এস এ পরিবহন, এস আর ট্রাভেলস, হানিফ পরিবহন, কেয়া পরিবহন, বাবলু এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন ইত্যাদি বাসে চড়ে দিনাজপুর যেতে পারবেন।

নন-এসি ও এসি বাস ভেদে জনপ্রতি ভাড়া ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। সারাদিন প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় ঢাকা থেকে দিনাজপুর বাস ছেড়ে যায়। এছাড়া ঢাকার উত্তরা থেকে কিছু পরিবহন দিনাজপুর যায়।

ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন একতা এক্সপ্রেস প্রতি মঙ্গলবার বাদে সন্ধ্যা ৭ টা ৪০ মিনিটে এবং দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেন প্রতি বুধবার বাদে সকাল ৯ টা ৫০ মিনিটে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া এসি বার্থ ৮৯৭ টাকা, এসি চেয়ার ৬১৮ টাকা, প্রথম শ্রেণি বার্থ ৫৩৫ টাকা, প্রথম শ্রেণি চেয়ার ৩৫০ টাকা, শোভন চেয়ার ২৫০ টাকা, শোভন সিট ১৮৫ টাকা।

দিনাজপুর শহর শহর থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা করে রামসাগর দীঘি ও জাতীয় উদ্যানে যেতে পারবেন।

কোথায় খাবেন

দিনাজপুর শহরে খাবার জন্য ভালো মানের অনেক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে দিলশাদ রেস্তোরাঁ, রুস্তম হোটেল, ফাইভ স্টার হোটেল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পুলাহাট বিসিক এলাকায় অবস্থিত আবুল হোটেলে সাদা ভাত, গরু বা মুরগির মাংস, ডাল, মাছ, ডিম, সবজি, ভর্তা, সালাদ ইত্যাদি খেতে পারেন।

কোথায় থাকবেন

আপনি রামসাগর বন বিভাগের বাংলোতে অনুমতি নিয়ে থাকতে পারেন। এখানে এসি, নন-এসি সব ধরনের রুম রয়েছে। নন-এসি রুমের ভাড়া ৫০০ টাকা এবং এসি রুমের ভাড়া ১,০০০ টাকা।

দিনাজপুর শহরে থাকার জন্য ভালো মানের অনেক হোটেল-মোটেল রয়েছে। দিনাজপুর অবস্থিত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেলে অগ্রিম বুকিং (0531-64718, 9899288-91) দিয়ে থাকতে পারেন। পর্যটন মোটেলে প্রতি রাতের ভাড়া ১,৫০০ থেকে ২,২০০ টাকা।

এছাড়া দিনাজপুর শহর অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে হোটেল ডায়মন্ড (0531-64629), হোটেল আল রশিদ (0531-64251), নিউ হোটেল (0531-68122), হোটেল নবীন (0531-64178), হোটেল রেহানা (0531-64414) উল্লেখযোগ্য।

আশেপাশে আরো দর্শনীয় স্থান

রামসাগর ছাড়াও দিনাজপুর আরো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। আপনি হাতে সময় নিয়ে এসব দর্শনীয় স্থান সমূহ ঘুরে দেখতে পারেন। এর মধ্যে কান্তজির মন্দির, নয়াবাদ মসজিদ, সুরা মসজিদ, দীপশিখা স্কুল, স্বপ্নপুরী পিকনিক স্পট, দিনাজপুর রাজবাড়ী উল্লেখযোগ্য।