মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা নদীর উপর নির্মিত বাংলাদেশ সবচেয়ে দীর্ঘতম সেতু পদ্মা বহুমুখী সেতু। স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের পর পদ্মা সেতুর আশেপাশে অনেক দর্শনীয় স্থান গড়ে উঠেছে। আজকের ভ্রমণ টিপসে আপনাকে জানাবো পদ্মা সেতুর আশেপাশে সেরা ১০ টি দর্শনীয় স্থান। এসব দর্শনীয় স্থানে প্রতিদিন শতশত দর্শনার্থীরা ভিড় জমাচ্ছেন।
পদ্মা সেতুর আশেপাশে সেরা ১০ টি দর্শনীয় স্থান
#১ মৈনট ঘাট (মিনি কক্সবাজার)
দোহার উপজেলার মৈনট ঘাট মিনি কক্সবাজার নামে পরিচিত লাভ করেছে। এখান থেকে পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউ ও শেষ বিকালের সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পারবেন। নৌকায় বা স্পিড বোটে পদ্মা নদীতে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। প্রিয়জনের হাত ধরে বালুময় চরে ঘুরে বেড়াতে পারবেন।
ঢাকা থেকে একদিনের ট্যুরে মৈনট ঘাট (মিনি কক্সবাজার) ঘুরে আবার ঢাকায় ফিরে আসা যায় বলে ভ্রমণ প্রেমী মানুষের কাছে মৈনট ঘাট জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিনতি হয়েছে।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার গুলিস্তান থেকে যমুনা ডিলাক্স পরিবহনের বাসে চড়ে সরাসরি দোহার মৈনট ঘাট পর্যন্ত যেতে পারবেন। গুলিস্তান টু মৈনট ঘাট জনপ্রতি ভাড়া ১২০ টাকা। মৈনট ঘাট থেকে সন্ধ্যা ৬ টায় ঢাকাগামী শেষ বাস ছেড়ে আসে।
#২ সোনারং জোড়া মঠ
সোনারং জোড়া মঠ মুন্সীগঞ্জ জেলার টংগিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে অবস্থিত অষ্টাদশ শতাব্দীর একটি প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন। এটি মূলত একটি জোড়া মন্দির। ছোটটি শিবমন্দির এবং বড়টি কালীমন্দির। চুন-সুরকি ও ইটের তৈরি মঠের সামনে বড় একটি পুকুর আছে।
বিভিন্ন সময়ে দুর্বৃত্তরা মন্দির থেকে বিভিন্ন মূল্যবান পাথর, কষ্টি পাথর, শিবলিঙ্গ সহ মহামূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায়। সোনারং জোড়া মঠের সৌন্দর্য কালের বিবর্তনে বিলীন হয়ে গেলেও দুর-দুরান্ত থেকে বহু দর্শনার্থী এখানে ভিড় জমায়। বর্তমানে সোনারং জোড়া মঠ বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে আছে।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার গুলিস্তান, মিরপুর, আব্দুল্লাহপুর থেকে মাওয়াগামী বাসে চড়ে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী বা শ্রীনগর নেমে যাবেন। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে সোনারং জোড়া মঠ যেতে পারবেন।
#৩ ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি
১৯০০ শতকে জমিদার যদুনাথ রায় শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুল গ্রামে ঐতিহাসিক ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি প্রতিষ্ঠিত করেন। জমিদার তার পাঁচ সন্তানকে আলাদা আলাদা চারটি বাড়ি তৈরি করে দেন। বর্তমানে যেগুলো কোকিলপেয়ারি জমিদার বাড়ি, উকিল বাড়ি, জজ বাড়ি নামে পরিচিত।
তার নিজের বাড়িটি ছোট সন্তান নবকুমারকে দেন। ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ির জালনা দরজা একই আকারের হওয়ায় কোনটা জালানা আর কোনটা দরজা অনুমান করা বেশ কঠিন। দ্বিতলা বিশিষ্ট বাড়ির উপর তলায় যাওয়ার জন্য একটি বড় কাঠের সিঁড়ি আছে।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার গুলিস্তান থেকে গরিবে নেওয়াজ, সেবা, মহানগর বা আরাম পরিবহনে চড়ে বালাসুর বাজার নেমে যাবেন। সেখানে থেকে রিকশা বা সিএনজি করে ভাগ্যকুল জমিদার বাড়ি যেতে পারবেন।
#৪ মাওয়া ঘাট
মাওয়া ঘাট থেকে বিকাল বেলা পদ্মা নদী ও পদ্মা সেতুর সৌন্দর্য দেখতে অসাধারণ লাগে। পদ্মা নদীতে ভেসে বেড়ানো জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বহু মানুষ পদ্মার তাজা ইলিশ মাছ খেতে মাওয়া ঘাটে যায়। চাইলে বিকালে পদ্মা নদীতে ১৫০ টাকায় স্পীড বোটে চড়ে বেড়াতে পারেন।
যারা ইলিশ ভোজন ও নদী ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন তাদের জন্য মাওয়া ফেরিঘাট জনপ্রিয় একটি স্থান। ঢাকা থেকে একদিনে ঘুরে আসতে পারবেন।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী থেকে ইলিশ পরিবহন, প্রচেষ্টা পরিবহন, স্বাধীন এক্সপ্রেস, বসুমতি পরিবহন ও বিআরটিসি পরিবহনে চড়ে সরাসরি মাওয়া ঘাট যেতে পারবেন।
#৫ পদ্মা রিসোর্ট
মুন্সীগঞ্জ জেলার পদ্মা পাড়ে মাওয়া ফেরিঘাটের পাশে অবস্থিত পদ্মা রিসোর্ট একটি দর্শনীয় স্থান। রাজধানী ঢাকার পাশে হওয়ায় বন্ধু-বান্ধব পরিবার-পরিজন নিয়ে বহু মানুষ এই রিসোর্টে বেড়াতে আসেন। এখানে আপনি ডে-প্যাকেজ ও নাইট-প্যাকেজে থাকতে পারবেন।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী থেকে স্বাধীন এক্সপ্রেস, ইলিশ পরিবহন, প্রচেষ্টা পরিবহন, বসুমতি পরিবহন ও বিআরটিসি পরিবহনে চড়ে সরাসরি মাওয়া ঘাট যাবেন। মাওয়া ঘাট থেকে ট্রলার বা স্পিডবোটে করে রিসোর্টে যেতে পারবেন।
#৬ মাওয়া রিসোর্ট
মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার কান্দিপাড়া গ্রামে পদ্মার পাড়ে নির্জন প্রকৃতির মাঝে গড়ে তোলা হয়েছে মাওয়া রিসোর্ট। দৃষ্টিনন্দন এই রিসোর্টে বিশাল একটি দীঘি আছে। দীঘির চারপাশে নারিকেল ও সুপারি গাছ আছে। দীঘির জলে বোড রাইডিং ব্যবস্থা আছে।
রিসোর্টে গেস্টদের জন্য ভিআইপি কেবিন সহ সুইমিংপুল, রেস্টুরেন্ট, খেলার মাঠ, সেলফি জোন, বসার বেঞ্চ এবং পদ্মা নদীর বুকে ভেসে বেড়ানোর জন্য বোড রাইডিং ব্যবস্থা আছে। রিসোর্টে প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ১০০ টাকা।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার মিরপুর ১০, শাহবাগ ও ফার্মগেট থেকে স্বাধীন পরিবহন গুলিস্তান থেকে ইলিশ পরিবহনের বাসে লৌহজং থানা মসজিদ ঘাট নেমে যাবেন। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা করে মাওয়া রিসোর্ট যেতে পারবেন।
#৭ এম জে হলিডে রিসোর্ট
ঢাকার কাছে নিরিবিলি শান্ত সবুজে ঘেরা পরিবেশ বান্ধব এম জে হলিডে রিসোর্ট মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখানের ইচ্ছাপুরায় অবস্থিত। সুবিশাল এই রিসোর্ট রয়েছে সুইমিং পুল, ভূতের বাড়ি, কটেজ, বড়শি দিয়ে মাছ ধরার ব্যবস্থা, কিডস জোন, খেলার মাঠ, কর্পোরেট পিকনিক, বিয়ে, জন্মদিন, কর্পোরেট মিটিং, সম্মেলন, প্রেস কনফারেন্স সহ অন্যান্য সুবিধা।
এই রিসোর্ট চার ধরনের ডে আউট প্যাকেজ ব্যবস্থা আছে। জনপ্রতি খরচ হবে ৯০০ থেকে ১,৫০০ টাকা।
কিভাবে যাবেনঃ এম জে হলিডে রিসোর্ট যাওয়ার জন্য নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্থা আছে। ঢাকা কলেজের পূর্ব দিকে পেট্রল পাম্প থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা, ১০টা, দুপুর ২টা ও সন্ধ্যা ৬ টার সময় রিসোর্টের গাড়ি ছেড়ে যায়।
#৮ পদ্মা সেতু জাদুঘর
মুন্সিগঞ্জের দোগাছি এলাকায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের সার্ভিস এরিয়া-১ এ জাদুঘরটি অবস্থিত। ২০১৬ সালে পদ্মা সেতু জাদুঘর তৈরিতে প্রাণীর নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। পদ্মা নদীতে কোন কোন প্রাণী বাস করতো তার পূর্ণাঙ্গ একটি চিত্র দেখতে পাবেন পদ্ধা সেতু জাদুঘরে। এখানে ১,৪১৯ প্রজাতির প্রাণীর মোট ২,৩৫২ টি নমুনা আছে।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার গুলিস্তান থেকে ইলিশ পরিবহন, প্রচেষ্টা পরিবহন, স্বাধীন পরিবহনে চড়ে মুন্সিগঞ্জের দোগাছি যেতে পারবেন। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা করে জাদুঘর যেতে পারবেন।
#৯ স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু জাদুঘর কমপ্লেক্স
মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় অবস্থিত স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈতৃক নিবাস ঘিরে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু জাদুঘর কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ৩০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত গাছ-গাছালি, বিভিন্ন পশু-পাখির ম্যুরাল, কৃত্রিম পাহাড়-ঝরনা, বসার বেঞ্চ, বড় ছয়টি শান বাঁধানো দীঘি এবং দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য ত্রিকোণাকৃতির ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। জাদুঘরে তার ব্যবহৃত ও অনেক দুর্লভ ছবি প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার গোলাপ শাহ মাজারের কাছ থেকে ঢাকা-দোহার বাসে চড়ে রাড়িখাল তিন দোকানের সামনে নেমে যাবেন। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা করে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু জাদুঘর কমপ্লেক্স যেতে পারবেন।
#১০ পদ্মার পাড় ভ্রমণ
স্বপ্নের পদ্মা সেতু দেখার জন্য অনেকের আগ্রহ আছে। আপনি ঢাকা থেকে একদিনে পদ্মা সেতু সহ পদ্মা নদীতে হাউজ বোট বা স্পিড বোট চড়তে পারবেন। এছাড়া পদ্মা নদীর তাজা ইলিশ খেতে পারবেন। প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থীরা পদ্মা পাড় ভ্রমণে আসেন।
কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার গুলিস্তান, মিরপুর ১০ থেকে পদ্মা সেতু গামী যেকোনো বাসে চড়ে পদ্মা পাড় আসতে পারবেন। এছাড়া নিজস্ব গাড়িতে আসতে পারবেন।





