লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মৌলভীবাজার

সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার আংশিক অংশ নিয়ে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান (Lawachara National Park)। এটি বাংলাদেশ সরকারের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ১৯২৫ সালে ততকালীন ব্রিটিশ সরকার এখানে বৃক্ষয়ন শুরু করে। পরিচিতির দিক থেকে সুন্দরবনের পরে এর অবস্থান। বর্তমানে বাংলাদেশে যে ১০টি জাতীয় উদ্যান ও ৭টি অভয়ারণ্য আছে তার মধ্যে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান অন্যতম।

১২৫০ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট এই উদ্যানকে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ সালে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মর্যদা দেয়। প্রকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই লাউয়াছড়া বনকে অনেকে প্রকৃতিক জাদুঘরও বলে থাকে।

উঁচু-নিচু টেলা জুড়ে বিস্তৃত এই বন। এই বনভূমির বৈশিষ্ট্য হল বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্ত প্রায় জীব-জন্তু, পাখি, উদ্ভিদ এবং অরকিট। বিলুপ্ত প্রায় উল্লুকের জন্য এই বন বিখ্যাত। এছাড়া রয়েছে বিচিত্র ভেষজ উদ্ভিদের বাগান। জুলভার্নের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে মাইকেল অ্যান্ডসোন পরিচালিত অস্কার জয়ী “অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ” ছবিটির একটি দৃশ্যের শুটিং করা হয়েছিল এই বনে।

জীব বৈচিত্র্যে অনন্য নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য সারা বছর এখানে পর্যটকদের আগমন ঘটে। বিশেষ করে শীতের মৌসুমে পর্যটকদের উপস্থিত বেড়ে যায়। শহরের নাগরিক কোলাহল ছেড়ে এই প্রকৃতিক বন জাদুঘরে এলে মন ভরে যায় প্রশান্তিতে এবং চোখের সামনে ধরা দেয় প্রকৃতি। ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট হিসেবে খ্যাত লাউয়াছড়া উদ্যান মৌলভীবাজার জেলার সেরা দর্শনীয় স্থান।

BM Khalid Hasan Sujon

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যা দেখতে পাবেন

দুর্লভ উদ্ভিদ ও বৈচিত্র্যময় প্রাণী লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ। এই বনে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে লোহাকাঠ, আকাশমনি, সেগুন, চাপালিশ, আগর, আওয়াল, জারুল, গর্জন, জাম, নাগেশ্বর, তুন, শিরিষ, গন্ধরুই, মুলী বাঁশ, গামারি উল্লেখযোগ্য। ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ৪ প্রজাতির উভচর ও ৬ প্রজাতির সরীসৃপ দেখতে পাবেন। 

বনে উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণীর মধ্যে হনুমান, লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, মেছোবাঘ, মায়া হরিণ, শিয়াল, বানর, কালো ভাল্লুক, রামকুত্তা, অজগর, গুইসাপ, কচ্ছপ, বনমোরগ, বনবিড়াল, বন্যকুকুর, কাঠবিড়ালি, চিতাবিড়াল উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও ঈগল, সবুজ ঘুঘু, তুর্কি বাজ, টিয়া, প্যাঁচা, কালো ফিঙে, বুলবুলি, তোতা, কোকিল, ময়না, ধনেশ সহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

লাউয়াছড়া জাতীয় বনের জীব বৈচিত্র্য খুব কাজ থেকে দেখার জন্য ৩টি ট্রেইল আছে। তিন ঘন্টা, এক ঘন্টা ও আধা ঘণ্টার এই ট্রেইল গুলোতে ট্রেকিং করে বনের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। বনের মধ্যে উঁচু উঁচু গাছ, পাখির কিচিরমিচির, ঝিঝি পোকার গান, নিরবতা সবকিছু আপনাকে বিমোহিত করবে।

BM Khalid Hasan Sujon

লাউয়াছড়া বনের ভেতর দিয়ে ঢাকা-সিলেট রেললাইন চলে গেছে। এই রেললাইন দর্শনার্থীদের পছন্দের একটি স্থান। এখানে অনেক দর্শনার্থীদের ছবি ও ভিডিও করতে দেখা যায়। এছাড়া বনের ভেতর আছে খাসিয়াপুঞ্জি, ঝিরি, চা বাগান ও পানের বরজ। বনে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের নামাজ পড়ার জন্য একটি মসজিদ আছে।

বনের কোন ট্রেইলে কি দেখবেন

তিন ঘণ্টার ট্রেইলঃ বনে তিন ঘন্টার রোমাঞ্চকর এই ট্রেইলে খাসিয়াপুঞ্জি ও তাদের পানের বরজ দেখতে পাবেন। ১৯৫০ সালের দিকে বন বিভাগ এই পুঞ্জি তৈরি করেন। এ পথে ট্রেকিং করার সময় বিশাল বাঁশ বাগানের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। এই বাঁশ বাগানে দেখতে পাবেন কুলু বানর ও লজ্জাবতী বানর। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও পথের শেষের দিকে উল্লুকের দেখা মিলতে পারে।

এক ঘন্টার ট্রেইলঃ লাউয়াছড়া বনে এক ঘন্টার ট্রেইলের শুরুতে গন্ধরুই গাছ, ডুমুর, কাঠালি চাঁপা, ঝাওয়া, মুলী বাঁশ, লোহা, চাপলিশ, গামারি সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ দেখতে পাবেন। দেখতে পাবেন ডুমুর গাছের ফল খেতে আসা বানর, হনুমান, উল্লুক সহ নানা ধরনের বন্যপ্রাণী। ভাগ্য ভালো থাকলে দেখা মিলতে পারে বন মোরগ ও মায়া হরিণ।

আধা ঘণ্টার ট্রেইলঃ আধা ঘণ্টার ট্রেকিং এ অল্প সময়ে লাউয়াছড়া জাতীয় বনের প্রকৃতিক জীব বৈচিত্র্য উপভোগ করতে পারবেন। এই পথের শুরুতে রেললাইন ও উঁচু উঁচু গাছের সারি। গাছে দেখা মিলবে কুলু বানরের দল। উঁচু উঁচু গাছের ভেতর দিয়ে এই ট্রেইল তৈরি করায় বনের নির্জনতা উপভোগ করতে পারবেন। গাছের ডালে দেখা মিলবে বুনো আর্কিড ফুল। নির্দেশিত পথ ধরে হাটতে হাটতে ট্রেইলটি শেষ হবে শুরু স্থানেই।

BM Khalid Hasan Sujon
পরামর্শঃ বনের ভেতর ট্রেইলে সহয়তার জন্য গাইড নেওয়া ভালো। গাইড খরচ ৪০০-৬০০ টাকা।

লাউয়াছড়া প্রবেশ টিকিট ফি

টিকিট বিবরণটিকিট মূল্য
১২ বছরের উর্ধে১১৫ টাকা
১২ বছরের নিচে৫৭.৫ টাকা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে আগত শিক্ষার্থী গ্রুপ ১০০ জন পর্যন্ত১১৫০ টাকা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে আগত শিক্ষার্থী গ্রুপ ১০০ জনের উর্ধে১৭২৫ টাকা
বিদেশী পর্যটক১১৫০ টাকা
মাইক্রোবাস/জিপ/কার পার্কিং১১৫ টাকা
বাস/মিনিবাস পার্কিং২৩০ টাকা

এক দিনের ট্যুর প্লান

লাউয়াছড়া বনের সৌন্দর্য খুব কাছ থেকে উপভোগ করতে ১ থেকে ৩ ঘন্টার বেশি সময় লাগবে না। তাই দিনের বাকি সময় শ্রীমঙ্গলের আশেপাশের দর্শনীয় স্থান সমূহ ঘুরে দেখতে পারেন। একদিনে শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ পরিকল্পনা করতে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ পড়ুন।

যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যাওয়ার সবচেয়ে আরামদায়ক মাধ্যম ট্রেন ভ্রমণ। এছাড়া ঢাকা থেকে বাসেও যেতে পারবেন।

ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কালনী এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনে শ্রীমঙ্গল যেতে পারবেন। ট্রেনের শ্রেণী ভেদে জনপ্রতি ভাড়া ২৪০ থেকে ৮২৮ টাকা। ঢাকা-শ্রীমঙ্গল ট্রেনে যেতে সময় লাগবে প্রায় সাত থেকে সাড়ে সাত ঘন্টা।

ঢাকার সায়েদাবাদ বা ফকিরাপুল বাস টার্মিনাল থেকে হানিফ পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, এনা পরিবহন, সিলেট এক্সপ্রেসের এসি/নন-এসি বাসে চড়ে শ্রীমঙ্গল যেতে পারবেন। নন-এসি/এসি বাস ভেদে জনপ্রতি ভাড়া ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। ঢাকা-শ্রীমঙ্গল বাসে যেতে সময় লাগে প্রায় চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টা।

শ্রীমঙ্গল পৌঁছে যেখান থেকে সিএনজি/ইজিবাইক/জীপ/মাইক্রোবাস/মোটরবাইক ভাড়া করে লাউয়াছড়া উদ্যানে যেতে পারবেন। সারাদিনের জন্য (যাওয়া-আসা) রিজার্ভ সিএনজি ভাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

শ্রীমঙ্গল শহরে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল ও মনোরম পরিবেশের রিসোর্ট আছে। এছাড়া চা বাগানের মধ্যে অনেক সরকারি-বেসরকারি গেস্ট হাউজ (0861-52350) ও কটেজ আছে। লাউয়াছড়া উদ্যানের পাশে অবস্থিত পাঁচ তারকা মানের গ্রান্ড সুলতান গলফ রিসোর্ট। এই রিসোর্টের সৌন্দর্য যেকোনো মানুষের আকর্ষন করবে।

এছাড়াও টিলাগাঁও ইকো ভিলেজ রিসোর্ট, নিসর্গ লিচিবাড়ি কটেজ, লেমন গার্ডেন রিসোর্ট, টি রিসোর্ট ও মিউজিয়াম, নভেম ইকো রিসোর্ট, শান্তি বাড়ি রিসোর্ট, অরণ্যের দিনরাত্রি রিসোর্ট উল্লেখযোগ্য। এসব রিসোর্ট গুলোর মধ্যে পছন্দতম একটিতে রাত্রিযাপন করতে পারেন।

শ্রীমঙ্গল হোটেল ভাড়ামৌলভীবাজার হোটেল ও যোগাযোগ তথ্য জানতে এই আর্টিকেলটি সম্পূর্ণ পড়ুন।

কোথায় খাবেন

লাউয়াছড়া জাতীয় বনের ভেতর দর্শনার্থীদের খাবার জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই দর্শনার্থীদের সাথে করে হালকা খাবার ও পানি নিয়ে যেতে হবে। ভারি খাবার শ্রীমঙ্গল শহরে গিয়ে খেতে হবে। শ্রীমঙ্গল শহরে পানশী রেস্টুরেন্টে কয়েক আইটেমের ভর্তা ভাজিসহ নানা পদের সুস্বাদু খাবার খেতে পারবেন।

লাউয়াছড়া উদ্যান ভ্রমণ টিপস ও সর্তকতা

  • গাইড বাদে অপরিচিত কারো সাথে বনের গভীরে যাবেন না, এতে আপনার ক্ষতি হতে পারে।
  • শীতকাল বাদে অন্য সময় বনে জোঁক ও সাপ থেকে সতর্ক থাকুন।
  • রেললাইনে হাঁটার সময় ট্রেন আসার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
  • বনের ভেতর উচ্চ শব্দে হৈচৈ করবেন না এতে প্রাণীদের চলাফেরা ব্যহত হয়।
  • বনের যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলে নিদিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলবেন, এতে জীব বৈচিত্র্যের ক্ষতি হতে পারে।
  • কম খরচে ভ্রমণ করতে রিজার্ভ গাড়ি না নিয়ে লোকাল সিএনজি বা বাসে যাতায়াত করুন।