দিনাজপুর জেলা শহর থেকে উত্তরে ৪০ কিলোমিটার এবং বীরগঞ্জ উপজেলা থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে ভোগনগর ইউনিয়নে অবস্থিত সিংড়া জাতীয় উদ্যান (Singra National Park)। এটি বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যা স্থানীয়ভাবে সিংড়া শালবন হিসেবে পরিচিত। ডালাগ্রাম, চাউলিয়া, সিংড়া ও নর্তানদী চারটি মৌজা নিয়ে বিস্তৃত বনভূমির মোট আয়তন ৩৫৫ হেক্টর এবং এর মধ্যে জাতীয় উদ্যানের পরিমান ৩০৫.৬৯ হেক্টর।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে সিংড়া বনকে বনবিভাগের অধীনে নিয়ে গেজেট প্রকাশ হয়। এরপর ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ এবং পর্যটন উন্নয়নের লক্ষে এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সিংড়া বনের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় সিংড়া জাতীয় উদ্যান।
সিংড়া জাতীয় উদ্যানের প্রধান বৃক্ষ শাল গাছ। এছাড়া এখানে রয়েছে তরুল, জারুল, শিমুল, শিলকড়ই, মিনজিরি, সেগুন, আকাশমনি, সোনালু, হরতকি, আমলকি, গামার, ঘোড়ানিম সহ নাম না জানা বহু উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম।
সবুজ শাল বনের বুক চিরে বয়ে গেছে নর্ত নদী, যা উদ্যানের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। নদীর কুলকুল ধ্বনি, স্বচ্ছ পানি ও শীতল বাতাস পর্যটকদের সকল ক্লান্তি দুর করে দেয়। নদীর তীরে দেখতে পাবেন সাঁওতাল নারী-পুরুষদের জাল দিয়ে মাছ ধরার দৃশ্য।
জাতীয় উদ্যানের অভ্যন্তরে বড় একটি পুকুর রয়েছে। যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। বনের প্রানীরা এই পুকুর থেকে তাদের তৃষ্ণা মেটায়। এছাড়া উদ্যানের মধ্যে রয়েছে বড় বড় উঁইপোকার মাটির তৈরি ঢিবি। যা সচরাচর দেখতে পাবেন না। উদ্যানের ভিতর সিংড়া মৌজায় বহুপুরাতন একটি খ্রীষ্টান মিশন রয়েছে।
জানা যায় এক সময় এই বনে বাঘ, নীলগাই সহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্য জীবজন্তুর আবাস স্থান ছিল। বনভূমি ধ্বংসের কারণে এসব জীবজন্তু এখান থেকে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে এখানে শিয়াল, খরগোশ, বেজি, সাপ, কাঁকবিড়ালি সহ বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু দেখা যায়। এছাড়া কোকিল, পেঁচা, মাছরাঙা, ঘুঘু, বুলবুলি, টুনটুনি, শকুন সহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখতে পাবেন। বনের ভিতর শকুন প্রজোজন কেন্দ্র রয়েছে।
শীতের মৌসুমে এই জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের আগমন বৃদ্ধি পায়। যদি উদ্যানের সবুজময় ভরা যৌবন ও নদীর উচ্চলতা দেখতে চান তাহলে বর্ষাকালে যেতে হবে। পর্যটকদের সুবিধার জন্য এখানে ছোট পরিসরে ২ টি পিকনিক স্পট ও একটি ছোট রেস্ট হাউজ রয়েছে।
সিংড়া জাতীয় উদ্যানের জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে আরডিআরএস বাংলাদেশ এর সহযোগিতায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠন করা একটি সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি কাজ করছে।
সিংড়া জাতীয় উদ্যান কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে চড়ে খুব সহজে দিনাজপুর যেতে পারবেন। ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে দিনাজপুরগামী নাবিল পরিবহন, এস এ পরিবহন, এস আর ট্রাভেলস, হানিফ পরিবহন, কেয়া পরিবহন, বাবলু এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন ইত্যাদি বাসে চড়ে দিনাজপুর যেতে পারবেন। নন-এসি ও এসি বাস ভেদে জনপ্রতি ভাড়া ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা।
দিনাজপুর জেলা শহরে নেমে সেখান থেকে বাসে চড়ে বীরগঞ্জ উপজেলা যাবেন। বীরগঞ্জ উপজেলা থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে সরাসরি সিংড়া জাতীয় উদ্যান যেতে পারবেন।
ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন একতা এক্সপ্রেস প্রতি মঙ্গলবার বাদে সন্ধ্যা ৭ টা ৪০ মিনিটে এবং দ্রুতযান এক্সপ্রেস ট্রেন প্রতি বুধবার বাদে সকাল ৯ টা ৫০ মিনিটে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া এসি বার্থ ৮৯৭ টাকা, এসি চেয়ার ৬১৮ টাকা, প্রথম শ্রেণি বার্থ ৫৩৫ টাকা, প্রথম শ্রেণি চেয়ার ৩৫০ টাকা, শোভন চেয়ার ২৫০ টাকা, শোভন সিট ১৮৫ টাকা।
এছাড়া ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নেমে বাসে করে বীরগঞ্জ উপজেলা গিয়ে সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা করে সিংড়া বন বা জাতীয় উদ্যান যেতে পারবেন।
কোথায় থাকবেন
দিনাজপুর শহরে থাকার জন্য ভালো মানের অনেক হোটেল-মোটেল রয়েছে। দিনাজপুর অবস্থিত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেলে অগ্রিম বুকিং (0531-64718, 9899288-91) দিয়ে থাকতে পারেন। পর্যটন মোটেলে প্রতি রাতের ভাড়া ১,৫০০ থেকে ২,২০০ টাকা।
এছাড়া দিনাজপুর শহর অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে হোটেল ডায়মন্ড (0531-64629), হোটেল আল রশিদ (0531-64251), নিউ হোটেল (0531-68122), হোটেল নবীন (0531-64178), হোটেল রেহানা (0531-64414) উল্লেখযোগ্য।
আপনি চাইলে রামসাগর বন বিভাগের বাংলোতে অনুমতি নিয়ে থাকতে পারেন। এখানে এসি, নন-এসি সব ধরনের রুম রয়েছে। নন-এসি রুমের ভাড়া ৫০০ টাকা এবং এসি রুমের ভাড়া ১,০০০ টাকা।
কোথায় খাবেন
দিনাজপুর শহরে খাবার জন্য ভালো মানের অনেক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে রুচিতা, আনন্দ রেস্তোরাঁ, দিলশাদ রেস্তোরাঁ, বনফুল এন্ড কোং, রুস্তম হোটেল, ফাইভ স্টার হোটেল, খাবার ঘর উল্লেখযোগ্য।
আশেপাশে আরো দর্শনীয় স্থান
সিংড়া জাতীয় উদ্যান ছাড়াও দিনাজপুর জেলায় অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে স্বপ্নপুরী, রামসাগর দীঘি, কান্তজির মন্দির, নয়াবাদ মসজিদ, সুরা মসজিদ, দীপশিখা স্কুল উল্লেখ্যযোগ্য।





