নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপূর্ব নীলাভূমি বান্দরবানে অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়, ছোট ছোট আদিবাসীদের গ্রাম, ঝর্ণা, ঝিরি, জলপ্রপাত আছে। এমনিই একটি জলপ্রপাতের নাম রেমাক্রি জলপ্রপাত (Remakri waterfall)। বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ১১৮ কিলোমিটার দূরে থানচি উপজেলার রেমাক্রি ইউনিয়নে অবস্থিত এই জলপ্রপাত।
রেমাক্রি জলপ্রপাতের উচ্চতা খুব বেশি না হলেও এটি বেশ চওড়া। জলপ্রপাতটি অগভীর, খরস্রোতা ও ছোট বড় পাথরে ভর্তি। বর্ষাকালে পানির তীব্র স্রোত দেখা যায়। শীতকালে স্রোত কমে যায়। বর্ষাকালে জলপ্রপাতে পানির পরিমান আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
কোথায় কোথায় গভীর পানি থাকলেও অধিকাংশই হেঁটে পার হওয়া যায়। পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে সৃষ্টি এই জলপ্রপাতের পানি শীতকালে স্বচ্ছ থাকে। রেমাক্রি জলপ্রপাতের অবস্থান দুর্গম জায়গায়। এখানে যেতে হলে পাহাড়, নদী পার হয়ে যেতে হবে।
দুর্গম পথ হওয়ার এখানে একসময় পর্যটকদের আনাগোনা কম ছিলো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে জলপ্রপাত এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই জলপ্রপাতের পাশ দিয়ে হেঁটে পর্যটকেরা নাফাখুম জলপ্রপাত যেতে পারবেন।
রেমাক্রি জলপ্রপাত যাওয়ার উপযুক্ত সময়
রেমাক্রি জলপ্রপাত এর সৌন্দর্য একের সময় একেক রকম। বর্ষাকালে পানি বেশি থাকে, শীতকালে পানি কমে যায় কিন্তু একেবারে পানি ফুরিয়ে যায় না। তাই রেমাক্রি জলপ্রপাত ভ্রমণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে মার্চ মাস।
এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বর্ষায় সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি থাকায় রেমাক্রি জলপ্রপাত ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। তাই এসময় কর্তৃপক্ষ ভ্রমণের অনুমতি দেয় না।
কিভাবে যাবেন
রেমাক্রি জলপ্রপাত ভ্রমণে যেতে হলে প্রথমে আপনাকে বান্দরবান জেলা শহর আসতে হবে। ঢাকার সায়েদাবাদ, কলাবাগান, আরামবাগ থেকে হানিফ পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, দেশ পরিবহন ও সেন্টমার্টিন পরিবহনের এসি/নন-এসি বাস প্রতিদিন বান্দরবান ছেড়ে আসে। নন-এসি/এসি বাস ভেদে জনপ্রতি ভাড়া ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। যেতে সময় লাগে প্রায় ৭ ঘন্টা।
আবার ঢাকা থেকে ট্রেন বা বিমানে চট্টগ্রাম নেমে সেখান থেকে বাস বা প্রাইভেট কারে বান্দরবান যেতে পারবেন। চট্টগ্রামের ধামপাড়া ও বহদ্দারহাট বাস স্টেশন থেকে জনপ্রতি ২৩০ টাকায় বান্দরবান শহর যেতে পারবেন।
বান্দরবান শহর থেকে বাস, জীপ গাড়ি বা চান্দের গাড়ি করে থানচি যেতে পারবেন। বাস ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা, চান্দের গাড়ি রিজার্ভ ভাড়া ৬,০০০ টাকা। একটি গাড়িতে ১০-১২ জন যেতে পারবেন। যাওয়ার পথে মিলনছড়ি, চিম্বুক পাহাড়, টাইটানিক ভিউ পয়েন্ট, ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্ট, নীলগিরি দেখে যেতে পারবেন। টিমের সদস্য ১০-১২ জন হলে চান্দের গাড়ি ভাড়া করা ভালো, তাহলে যাওয়ার পথে এই দর্শনীয় স্থান সমূহ ঘুরে দেখতে পারবেন।
থানচি বাজার বিজিবি ক্যাম্প থেকে গাইড ও যাওয়ার অনুমতি নিতে হবে। এজন্য আপনার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নাম্বার, আইডি কার্ডের ফটোকপি জমা দিতে হবে।
এরপর থানচি নৌকা ঘাট থেকে রেমাক্রি জলপ্রপাত যাওয়ার ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করতে হবে। নৌকা ভাড়া ৪,৫০০ টাকা, নৌকায় ৪-৫ জন যেতে পারবেন। যেতে সময় লাগবে প্রায় আড়াই ঘন্টা। যাত্রাপথে সাঙ্গু নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
কোথায় থাকবেন
রেমাক্রি বাজারে থাকার জন্য ছোট ছোট কর্টেজ আছে। জনপ্রতি ভাড়া ২০০ টাকা। রেমাক্রি ফলস এর পাশে শীলগিরি গেস্ট হাউজ আছে। একে স্থানীয়রা চেয়ারম্যানের গেস্ট হাউজ বলে। গেস্ট হাউজে থাকতে ১,০০০-২,০০০ টাকা খরচ হবে। এক রুমে ৭-৮ জন থাকতে পারবেন।
কোথায় খাবেন
শীলগিরি গেস্ট হাউজ এর রেস্টুরেন্ট আছে। এখানে ভাত, বয়লার মুরগী, বন মোরগ, ডিম, ডাল, ভর্তা, খিচুড়ি এর প্যাকেজ পাওয়া যায়। খাবার আগে অবশ্যই দাম জেনে নিবেন।
এছাড়া আদিবাসীদের বাড়ীতে খাবার খেতে পারবেন। গাইডকে বললে তিনি সব ব্যবস্থা করবেন। পাহাড়ে ভ্রমণে গেলে অবশ্যই পাহাড়ি ফল খেয়ে দেখবেন। পাহাড়ি ফল গুলো খুবই মিষ্টি হয়।
রেমাক্রি জলপ্রপাত ভ্রমণ পরামর্শ
- রেমাক্রি ভ্রমণে সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবেন।
- গাইড, আদিবাসীদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন।
- নদী, পাহাড়ী পথ হাঁটার জন্য গ্রীপের জুতা ব্যবহার করুন।
- সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট পরুন।
- প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, ঔষধ, পাওয়ার ব্যাংক সাথে রাখুন।
- দলবদ্ধ ভ্রমণ করুন, একে অন্যের সহয়তা করুন।





